সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার

দুপুর গড়িয়ে গেছে, অথচ সকালটা কেবল শুরু হলো। পুরোনো সকালবেলায় একবার উঠেছিলাম—লামিয়ার জ্বর, ওর জন্য নাস্তা বানাতে, ওষুধ খাওয়াতে। তখনও অবশ্য আমি ঘুমিয়ে, মাসল মেমরির ওপর ভরসা করে কিচেনওয়ার্ক। প্রতিদিনের মতো দুধ-চা চায়নি লামিয়া। আদা-চা। মায়ের পাঠানো ছোট্ট ইস্পাতের হামানদিস্তায় গতকাল ছিলে কেটে রাখা আদার টুকরোটা ছেঁচে নিয়ে আদা-চা খাওয়ালাম ওকে। আদা-চায়ে অবশ্য আমার ঘুম কাটেনি। কাটাতেও চাইনি। আমি বরং আরেক দফা ঘুমিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। লামিয়ার অফিসে যাওয়া উচিত ছিল না। কিন্তু সে গেছে। আমিও বারণ করিনি। সে গেছে আউট অব প্যাশন। পোস্ট-এআই দুনিয়ায় তো কেবল দু ধরনের মানুষই থাকবে—প্যাশনেট আর কর্পোরেট। এক পক্ষের থাকবে জীবন ও জীবনপ্রাণ, আরেক পক্ষের থাকবে কেবল যাপন ও বিলাস।

লামিয়া বেরিয়ে যাওয়ার আগে থেকেই আমি ঘুমানোর চেষ্টা করেছি। আমার মাথার মধ্যে একটা বিশাল মাঠে স্নাইপার রাইফেল নিয়ে শুয়ে আছি, আর আমার পাশে মিতু। মিতু ছিলেন আমার থিসিস স্টুডেন্ট। তিনি এসেছিলেন আমার আরেকটা স্বপ্নে, তাও বেশ আগের, যখন আমি আহত হই। মিতুর চোখ গভীর নয়, অগভীর; তবে চোখের কোটর গভীরভাবে কালো। এর বেশি মিতু সম্পর্কে বলা অসম্ভব, কারণ হিজাব করার কারণে আমরা, অন্তত আমি, তাঁকে কখনোই দেখি নাই।

স্বপ্নটা এখান থেকেই শুরু হতে পারত। কিন্তু হয়নি। আমার একটা যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি আছে। লাইন অব ফায়ার থেকে, রাত গভীর হলে, সামনে ক্রল করে এগিয়ে যাওয়া। এগোনোর সময় আমি মিতুকে কখনোই বলি না আমার সঙ্গে মুভ করতে। কিন্তু মিতু সবসময়ই থাকেন। কেন থাকেন, সেটা আমি বলতে পারি না। যুদ্ধ শেষ হলে, যদি কখনো হয়, জিজ্ঞাসা করতে হবে। অথচ স্বপ্নটা শুরু হয়নি, কারণ লাইন অব ফায়ার থেকে আমি ক্রলই শুরু করিনি। আমার যতটুকু মনে আছে, আমি মনে মনে নিজামকে খুঁজছিলাম এটা বলার জন্য যে সে যেন আমার এইট ফোর্টি-ফাইভ ও’ক্লকে ক্রল করতে থাকে। নিজামকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

এরপর গভীর অন্ধকার।

খালা কলিংবেল দিলে আমি সকাল শুরু করি।

খালা, আমাকে দুধ-চা দেন।

আলাদা করে বলে দিতে হয় না যে চিনি দিয়েন। চা খেয়ে স্নান করেছি। আর গরম স্রোতের মধ্যে দেখলাম নিজাম হেঁটে যাচ্ছে সদ্য চালু হওয়া নতুন রাস্তাটা ধরে। এই রাস্তার কোনো গন্তব্য নেই। এখনও কেবল একটা অসমাপ্ত নতুন লেন।

এই রাস্তাটা ধরে আমরা হেঁটে যাই টি-স্টলে, দিনে অন্তত দু-তিনবার তো বটেই। সেদিন শুক্রবারে আমরা বসে বসে একটা চা দুজন ভাগ করে খাচ্ছিলাম। খুব বেশি চা খাওয়া হয়ে যাবে ভেবেই কি নিজাম এই চা ভাগ করার বুদ্ধিটা বের করেছে? হতে পারে, অথবা খরচ বাঁচাতেও হতে পারে। টি-স্টলজনিত খরচের হিসাব-নিকাশ সেই রাখে। টাকা-পয়সার সংকট তার। আপাতত আমার না। তবে হতে কতক্ষণ। অবশ্য আমাদের আছে বিপুল সোশ্যাল ক্যাপিটাল। সেটা ভেঙেই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

ইদানীং আমরা তেমন গল্প করি না। আগে নিজাম বুগরা খানের গল্প করত। বুগরা খান হলো তার ট্রিলজির শেষ খণ্ডের নায়ক। আমি ঠিক করেছি, ট্রিলজির শেষ খণ্ডটা ইংরেজিতে অনুবাদ করে পেঙ্গুইন থেকে ছাপাব। আমি নিজে অনুবাদ করব। পিআর টিম রাখব বইটার প্রচার ও প্রসারের জন্য। এটা হচ্ছে নোবেল প্রজেক্ট। বইটা নোবেল না জিতলেও বুকার-টুকার কিছু একটা যেন জেতে, সেটার ব্যবস্থা করা। আমার ধারণা, এরকম কয়েকটা লিটেরারি প্রজেক্ট হাতে নিলে সাক্সেস আসবে। সাক্সেস বলতে নোবেল, বুকার—এগুলোই আর কি। শক্তিশালী পিআর টিম একটা ফ্যাক্ট। ড. ইউনূসের শক্তিশালী পিআর টিম ছিল। এখনও আছে। প্রধানমন্ত্রী (স্যার?) তারেক রহমানের পিআর টিমের চেয়েও শক্তিশালী—শুনেছি, আর কি।

নিজাম হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে।

আমি চা খেতে খেতে বললাম,

তুমি না হয় সাহিত্য করছ, কিন্তু আমি কী করব?

নিজাম হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে, কিন্তু আমি কী করব?

দ্রুত বিল মিটিয়ে অস্বস্তিকর গরমের মধ্যে বের হয়ে গেলাম।

তুমি তোমার ফাইটটা ধরতে পারছ না। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবা, সেটাই ঠিক করতে পারছ না বা করোনি।

আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি কিছু করতে পারি না। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার—স্যাড।

নিজাম হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। নিজাম পেট শক্ত করে হাঁটে। ওর বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। ওর বউ পোয়াতি।

আমার বাচ্চা-কাচ্চা নেওয়ার অনেস্টলি কোনো ইচ্ছা নাই। জিনিসটা ইদানীং আমি অপছন্দই করি। টাকা-পয়সা, জীবন কিংবা অসমাপ্ত রাস্তার জন্য না; হয়তো আগস্ট থেকে ডিসেম্বর বা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমি কিছুই করতে পারি না, সে জন্য।

স্নান থেকে বের হলেও নিজামের হেঁটে যাওয়া শেষ হয় না। নিজাম হেঁটে যাচ্ছে, অসমাপ্ত রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কারণ এই রাস্তাটা ছাড়া কাছেপিঠে আর কোনো রাস্তা নাই।

কিন্তু আমি কী করব?

Tags: ,

Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *