BanglaLit

You are currently browsing the archive for the BanglaLit category.

শাহী কোনো বাগিচা নয়,
অথবা নয় কোনো গুলশান-শালিমার রাজোদ্যান।
বরং নেহায়েতই সাদাসিধে,
অযত্নে বেড়ে ওঠা পুষ্পগুল্মের আয়োজন।
অপ্রস্তুত, ঝাঁকড়া—তবে বেয়ারা বুনো নয়।
তার ছত্রে ছত্রে ছত্রা।
কোথাও সবুজের মাঝে সাদা,
গোলাপি আর লাল।
ফুলেদের মেঠোপনা, অথচ মাঠ নয়—বাগান।

পুরোনো দালানের সাথে বসবাস,
ঝোপ, মস, ফাঙ্গাসের সাথে সহবাস—
তবে ঝাড় নয়।
দাই পিঁপড়া আর প্রজাপতির নিবিড় আবাসন।

সেইখানে গেলে দেখা যায়
ক্লান্তিহীন ক্লান্ত সময়—
প্রজাপতির পাখায় পাখায়,
সবুজের স্থির পাতায়,
ঝিঁঝিগ্রস্ত গাছেদের
সন্ধ্যার মতো নীরব খয়েরি ডালে।

Tags:

আমি আজ তোমাকে বলে যেতে চাই
আমার মৃত্যুর গভীরতম দৃশ্যের কথা—
আমি তোমাকে বলে যেতে চাই—
আমার মৃত্যু কারাগারের লোহার খাঁচায় হলেও,
আশাহত হয়ো না।

সেখানে হাজির হবে পাহাড় আর সাগর;

আমার মৃত্যু হবে পাহাড়, সাগর আর আকাশের নীলের মাঝে।
আমার রক্তকেশী স্রোত
আমার কলারবোনে ঝুলে থাকবে—
বেটোফেনের স্কার্ফের মতো।

আমার মৃত্যু হবে—
নর্ম্যান্ডির উপকূলে, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে।
আমি দেখি অজস্র সাদা বক,

সাদা বক উড়ে যায় মেঘের দেশে।

আমার পিস্তল-হোলস্টার উড়ে গেছে—
আততায়ীর মাউজারের লক্ষ্যভেদে।

আমার মৃত্যু হবে অযোধ্যায়—
নীপবন মাঝে,

গৌতম বুদ্ধের মতো
স্থির হ্রদে সাঁতার কাটা—
রাজহাঁসের মতো সুন্দর।


পাদটীকা: কবিতাটি ৮ জুলাই ২০২৬, ব্লাড ইনফেকশনে শয্যাশায়ী অবস্থায় ডিকশন দেওয়া হয়; লামিয়া তা লিখে রাখেন।

Tags:

লোকটার উপর রাগ চড়ে ছিল মেট্রোতে ওঠার সময় থেকে। বা, বলতে পারেন যখন প্যাসেঞ্জার কিউতে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন থেকেই। মেট্রো স্টেশনের কথা বলছি। আপনার নিশ্চয় মেট্রোতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে, দুটো তীরচিহ্ন আছে দু-সাইডে—ইনওয়ার্ড অ্যারো। অর্থাৎ বগির ভেতরের দিকে নির্দেশ করছে। ওঠার জন্য ওই দুই অ্যারো লাইন ধরেই দাঁড়াতে হয়। আর আউটওয়ার্ড একটা অ্যারো আছে মাঝ বরাবর। এই লাইনটা যারা বের হবে তাদের জন্য।

মূর্খ লোকটা এই বের হওয়ার লাইনটার মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে সস্তা সানগ্লাস। দেখেই বোঝা যায় রাস্তার পাশ থেকে কেনা। লোকটার পরনে কমলা রঙের টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট। যা হোক, সে ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার সাথে কথা বলছিল।

এ ধরনের অসভ্য মানুষদের আমার পছন্দ না, এরা পাবলিক লাইনে দাঁড়িয়ে জীবনের যাবতীয় গল্প করে। তার চেয়েও বিরক্তিকর বিষয় হলো ওটা ওদের দাঁড়ানোর লাইনও নয়। এদিক দিয়ে প্যাসেঞ্জাররা বের হবে। আগে বের হবে, পরে আমরা ঢুকব। বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ থাকলে কীভাবে আমরা ঢুকব?

কোনো সিস্টেম মেইনটেইন করে না এসব লোকজন। অসভ্য।

তবে লোকটার প্রতি মূল রাগ শুরু হলো ভেতরে ঢোকার সময়। সাথে থাকা মহিলাকে সামনে যেতে দিয়ে লোকটা যেন পুরো গেটটা দখল করে কচ্ছপের গতিতে ভেতরে ঢোকা শুরু করেছে। যেখানে সেকেন্ডের কিয়দংশে সিটগুলো সব ভরে যাচ্ছে, সেখানে মূর্খটার পাছা যেন চলছেই না।

অবশ্য সেই রাগ থেকেই যে খুন করেছি, ব্যাপারটা তা না। হয়তো খুনই করতাম না যদি না লোকটার সাথে আমার আবার দেখা হতো। কিন্তু হলো।

নেমেছিলাম শাহবাগ স্টেশনে। লোকটা আর ওই মহিলাটা নামল ওখানেই। কার্ড সুইপ করে স্টেশন থেকে বের হওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম, লোকটা মহিলাটাকে সঙ্গে নিয়ে কোত্থেকে এসে লাইনের এক্কেবারে সামনে সরাসরি ঢুকে গেল!

এরপর একটা বুকশপে ঢুকেছিলাম। খানিক বাদে লোকটা আর ওই মহিলা এসে ঢুকল। তারপর শুরু হলো গুজুর গুজুর, ফুসুর ফাসুর। ফোন বের করে—ক্লিক ক্লিক। দুটো ছবি দিয়ে দেবে ফেসবুকে। কোয়ালিটি টাইম, যত্তসব।

খানিক বাদে ওয়াশরুমে গেছি। দেখলাম, একটা বেসিন নেই। শুধু হোল্ডার স্ট্যান্ড দুটো রয়ে গেছে। হিশু সেরে হাত-মুখ ধুচ্ছিলাম। আয়নায় দেখলাম, লোকটা ঢুকছে। একা।

এবার কমলা গেঞ্জিটা দেখেই মেজাজ বিগড়ে গেল। লোকটার পেছনে এসে দিলাম এক ধাক্কা। বেশ জোরেই দিয়েছিলাম। হোল্ডার স্ট্যান্ডগুলোর একটা লোকটার পেটের মধ্যে ঢুকে গেল। ভোঁতা জিনিস। কিন্তু এফেক্টিভলি পেট পাংচার করে দেবে, ভাবতেই পারিনি।

“ভালো বলেছেন,” বললেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

“আপনি এখন যান। সবাইকে গল্পটা বলার দরকার নাই। সংক্ষেপে বলবেন, পা পিছলে পড়ে গেছিল মানুষটা। কমলা গেঞ্জি আমারও পছন্দ না।”

Tags: , , ,

বাতাবীবনের ছায়ায় ফিরে যাই বারবার।
জলধোয়া পুদিনার পাতায় চেহারা দেখে সন্ধ্যার তুলসী।

বাতাবীলেবুর গন্ধে মাতোয়ারা সে দুপুর।
জ্বর কাকে বলে জানি না তখনও।

দারুণ দুঃখ জন্মেছিল বহুকাল আগের এক জিওমিটারের মৃত্যুতে।
এসব বই এ বাড়িতে কে রাখে?

মা গোসল করিয়েছেন খানিক আগে।
কাজল পরিয়ে দিয়েছেন কপালে।
মাকে ভালো লাগে শাড়িতে।
মায়ের শরীরের ঘ্রাণ যেন জুড়ে আছে লেবুবন।

তখনও জ্বর কী জিনিস, জানি কি?
জিওমিটার আত্মহত্যা করেননি, মারা গেছেন পরে গিয়ে সিঁড়িতে।
সেখানে ইঁদুর ছিল।
দস্তয়েভস্কিই কি লিখেছেন এমন কথা?
আমি ছাড়া কবিদের মাঝে নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রি আর জানে কে?

মা বই পড়া পছন্দ করেন না।
অথচ বইসমেত বাতাবীবনে শুইয়ে দিয়েছেন।

মা এসেছেন ভ্রান্তির ছলে।
আমি তাঁর কাছ থেকে পালাতে চাই।
অথচ তিনি খানিক আগে গোসল করিয়েছেন নিমপাতা-ধোয়া জলে।
কপালে দিয়েছেন কাজল।

সেদিন খুব গরম হয়েছে শরীর।
তুমি বলেছ, পুরুষ অসুন্দর, অথচ নারী কী সুন্দর!

আমরা নারী-পুরুষ বর্ণনা করতে পারি কি?

পুরুষের ঝোলানো ধোন তোমার ভালো লাগে না।
তোমার কি তা বাঁদরের লেজের মতো মনে হয়?

অথচ যত বড় হয়েছি, ততই লেগেছে ভালো।

জিওমিটার পড়ে আছেন সিঁড়িতে।
কী দারুণ সুন্দর মৃতদেহ।

আমরা কি নারী আর পুরুষ বর্ণনা করতে পারি?
ধোন ছাড়া, স্তন ছাড়া?

আমরা কি নারী-পুরুষ বর্ণনা করতে পারি?
লাগানো ছাড়া?
ভালো কিছু শব্দ বোধ হয় খুঁজে দিতে পারো তুমি।
তাতে কি এটা পাল্টায় যে পুরুষ কেবল নারীকে আদরই করেছে?
আঘাত কি দেয়নি সে আদরের নামে?

ব্যাপারটা এরকমই যে তুমি নারী আর পুরুষকে দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করেছ…


আর তোমার তাতে ভালো লাগছে না।
কিন্তু দিন শেষে এটা লাগানোই।
তোমার প্রেমিক হয়তো আদরের কথাই বলে।

তুমি বুঝি কখনো পুরুষের মুঠোয় গেঁথে যাওনি!

অথচ তুমি বলছ, পুরুষ অসুন্দর।

তুমি হয়তো জ্বরগ্রস্ত সময়ে হ্যামকে শুয়ে শুয়ে জিওমিটারের মৃত্যু নিয়ে ভাবো না।

অথচ তুমি চাইলে স্নান সেরে বাতাবীবনমাঝে হারিয়ে যেতে পারতে।

Tags: , , , ,

দুপুর গড়িয়ে গেছে, অথচ সকালটা কেবল শুরু হলো। পুরোনো সকালবেলায় একবার উঠেছিলাম—লামিয়ার জ্বর, ওর জন্য নাস্তা বানাতে, ওষুধ খাওয়াতে। তখনও অবশ্য আমি ঘুমিয়ে, মাসল মেমরির ওপর ভরসা করে কিচেনওয়ার্ক। প্রতিদিনের মতো দুধ-চা চায়নি লামিয়া। আদা-চা। মায়ের পাঠানো ছোট্ট ইস্পাতের হামানদিস্তায় গতকাল ছিলে কেটে রাখা আদার টুকরোটা ছেঁচে নিয়ে আদা-চা খাওয়ালাম ওকে। আদা-চায়ে অবশ্য আমার ঘুম কাটেনি। কাটাতেও চাইনি। আমি বরং আরেক দফা ঘুমিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। লামিয়ার অফিসে যাওয়া উচিত ছিল না। কিন্তু সে গেছে। আমিও বারণ করিনি। সে গেছে আউট অব প্যাশন। পোস্ট-এআই দুনিয়ায় তো কেবল দু ধরনের মানুষই থাকবে—প্যাশনেট আর কর্পোরেট। এক পক্ষের থাকবে জীবন ও জীবনপ্রাণ, আরেক পক্ষের থাকবে কেবল যাপন ও বিলাস।

লামিয়া বেরিয়ে যাওয়ার আগে থেকেই আমি ঘুমানোর চেষ্টা করেছি। আমার মাথার মধ্যে একটা বিশাল মাঠে স্নাইপার রাইফেল নিয়ে শুয়ে আছি, আর আমার পাশে মিতু। মিতু ছিলেন আমার থিসিস স্টুডেন্ট। তিনি এসেছিলেন আমার আরেকটা স্বপ্নে, তাও বেশ আগের, যখন আমি আহত হই। মিতুর চোখ গভীর নয়, অগভীর; তবে চোখের কোটর গভীরভাবে কালো। এর বেশি মিতু সম্পর্কে বলা অসম্ভব, কারণ হিজাব করার কারণে আমরা, অন্তত আমি, তাঁকে কখনোই দেখি নাই।

স্বপ্নটা এখান থেকেই শুরু হতে পারত। কিন্তু হয়নি। আমার একটা যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি আছে। লাইন অব ফায়ার থেকে, রাত গভীর হলে, সামনে ক্রল করে এগিয়ে যাওয়া। এগোনোর সময় আমি মিতুকে কখনোই বলি না আমার সঙ্গে মুভ করতে। কিন্তু মিতু সবসময়ই থাকেন। কেন থাকেন, সেটা আমি বলতে পারি না। যুদ্ধ শেষ হলে, যদি কখনো হয়, জিজ্ঞাসা করতে হবে। অথচ স্বপ্নটা শুরু হয়নি, কারণ লাইন অব ফায়ার থেকে আমি ক্রলই শুরু করিনি। আমার যতটুকু মনে আছে, আমি মনে মনে নিজামকে খুঁজছিলাম এটা বলার জন্য যে সে যেন আমার এইট ফোর্টি-ফাইভ ও’ক্লকে ক্রল করতে থাকে। নিজামকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

এরপর গভীর অন্ধকার।

খালা কলিংবেল দিলে আমি সকাল শুরু করি।

খালা, আমাকে দুধ-চা দেন।

আলাদা করে বলে দিতে হয় না যে চিনি দিয়েন। চা খেয়ে স্নান করেছি। আর গরম স্রোতের মধ্যে দেখলাম নিজাম হেঁটে যাচ্ছে সদ্য চালু হওয়া নতুন রাস্তাটা ধরে। এই রাস্তার কোনো গন্তব্য নেই। এখনও কেবল একটা অসমাপ্ত নতুন লেন।

এই রাস্তাটা ধরে আমরা হেঁটে যাই টি-স্টলে, দিনে অন্তত দু-তিনবার তো বটেই। সেদিন শুক্রবারে আমরা বসে বসে একটা চা দুজন ভাগ করে খাচ্ছিলাম। খুব বেশি চা খাওয়া হয়ে যাবে ভেবেই কি নিজাম এই চা ভাগ করার বুদ্ধিটা বের করেছে? হতে পারে, অথবা খরচ বাঁচাতেও হতে পারে। টি-স্টলজনিত খরচের হিসাব-নিকাশ সেই রাখে। টাকা-পয়সার সংকট তার। আপাতত আমার না। তবে হতে কতক্ষণ। অবশ্য আমাদের আছে বিপুল সোশ্যাল ক্যাপিটাল। সেটা ভেঙেই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

ইদানীং আমরা তেমন গল্প করি না। আগে নিজাম বুগরা খানের গল্প করত। বুগরা খান হলো তার ট্রিলজির শেষ খণ্ডের নায়ক। আমি ঠিক করেছি, ট্রিলজির শেষ খণ্ডটা ইংরেজিতে অনুবাদ করে পেঙ্গুইন থেকে ছাপাব। আমি নিজে অনুবাদ করব। পিআর টিম রাখব বইটার প্রচার ও প্রসারের জন্য। এটা হচ্ছে নোবেল প্রজেক্ট। বইটা নোবেল না জিতলেও বুকার-টুকার কিছু একটা যেন জেতে, সেটার ব্যবস্থা করা। আমার ধারণা, এরকম কয়েকটা লিটেরারি প্রজেক্ট হাতে নিলে সাক্সেস আসবে। সাক্সেস বলতে নোবেল, বুকার—এগুলোই আর কি। শক্তিশালী পিআর টিম একটা ফ্যাক্ট। ড. ইউনূসের শক্তিশালী পিআর টিম ছিল। এখনও আছে। প্রধানমন্ত্রী (স্যার?) তারেক রহমানের পিআর টিমের চেয়েও শক্তিশালী—শুনেছি, আর কি।

নিজাম হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে।

আমি চা খেতে খেতে বললাম,

তুমি না হয় সাহিত্য করছ, কিন্তু আমি কী করব?

নিজাম হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে, কিন্তু আমি কী করব?

দ্রুত বিল মিটিয়ে অস্বস্তিকর গরমের মধ্যে বের হয়ে গেলাম।

তুমি তোমার ফাইটটা ধরতে পারছ না। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবা, সেটাই ঠিক করতে পারছ না বা করোনি।

আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি কিছু করতে পারি না। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার—স্যাড।

নিজাম হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। নিজাম পেট শক্ত করে হাঁটে। ওর বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। ওর বউ পোয়াতি।

আমার বাচ্চা-কাচ্চা নেওয়ার অনেস্টলি কোনো ইচ্ছা নাই। জিনিসটা ইদানীং আমি অপছন্দই করি। টাকা-পয়সা, জীবন কিংবা অসমাপ্ত রাস্তার জন্য না; হয়তো আগস্ট থেকে ডিসেম্বর বা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমি কিছুই করতে পারি না, সে জন্য।

স্নান থেকে বের হলেও নিজামের হেঁটে যাওয়া শেষ হয় না। নিজাম হেঁটে যাচ্ছে, অসমাপ্ত রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কারণ এই রাস্তাটা ছাড়া কাছেপিঠে আর কোনো রাস্তা নাই।

কিন্তু আমি কী করব?

Tags: ,

ঘোষণা

আমি শহীদুল জহিরের বইখানা সশব্দে বিছানায় ফেলে দিই, আদতে সরিয়ে রাখি সমস্ত জাদুবাস্তবতা।

জাদুবাস্তবতা কীসে হয়, আমি কখনো বোঝার চেষ্টা করি না সাহিত্যসমালোচকদের মতো; কেননা আমি জানি, সাহিত্যের দুনিয়ার ব্যুরোক্রেট তারা। আর ব্যুরোক্রেট মানেই চেয়ার, টেবিল ও ড্রয়ার। একেক ড্রয়ারে একেক ফাইল। জাদুবাস্তবতা সেরকম এক ড্রয়ারের নাম—সেটাই বলে তারা।

অথচ পুরো ব্যাপারটা হলো মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা কুয়াশার আরেক নাম। এই কুয়াশা দিয়ে কখনো মৌ আসে, কখনো শ্যামা। তারপর তারা কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়। তাদের মনে হয়, তারা জীবনের পথে হেঁটে যাচ্ছে।

অথচ জীবন কখনোই দূরে নয় যে তার দিকে হেঁটে যেতে হবে। জীবন এখানে, জীবন এখন।

কবি হিসেবে আমি ঘোষণা করতে পারি, আমিই জীবন।

ঘোষণার ব্যাপারটা কিন্তু খুব ড্রামাটিক নয়!

অতীতে ইলিয়াস শাহ নিজেকে ঘোষণা করেছেন শাহে বাঙাল। ইদানীং আমাদের বাংলায় স্বাধীনতার ঘোষক আছে, ঘোষণা এসেছে (স্বৈরাচারী?) শেখ মুজিবকে হত্যারও।

অতিসম্প্রতি শুনেছি, বিএনপির এক নেতা বলেছেন, জুলাই ’২৪-এর এক দফার ঘোষণা দিয়েছেন তারেক রহমান, লন্ডন থেকে। সে হিসাবে বিএনপিকে বলতে পারেন—বাংলাদেশ ঘোষণাবাদী দল।

যা হোক, লন্ডন একটা ঘোষণার কারখানা। ওদের ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন আছে। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন—বিবিসি।

সম্প্রতি এক ঘোষণার জেরে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিবিসিকে স্যু করেছেন দশ বিলিয়ন ডলার। দশ বিলিয়ন ডলারে কত শূন্য আছে, সেটা একটা জাদুবাস্তব ব্যাপার। যা হোক, বিবিসির সিইওর চাকরি গেছে। না, উনি নিজেই ছেড়েছেন। বড়দের চাকরি যায় না, নিজেরাই ছেড়ে দেন।

অবশ্য, শেখ হাসিনা দেননি। তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেননি, বা তাঁর পদত্যাগপত্র পাওয়া যায়নি—বলেছিলেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন ফেরার, ডিসেম্বরে।

তবে সবচেয়ে জাদুবাস্তবতার ঘোষণা দিয়েছে ওপেনএআই। তাদের মডেল সলভ করেছে নেভিয়ার–স্টোকস প্রবলেম। সেটা কী, জানতে হবে না; শুধু জেনে রাখুন, অনেক কঠিন প্রবলেম। খরচ হয়েছে মিলিয়ন ডলার। ফিল্ডস মেডালিস্টরা বলছেন, শুধু ঘোষণা দেওয়ার লোভে এই খরচ।

(ফিল্ডস মেডালিস্ট বিষয়টা আবার আরেক ঘোষণার ব্যাপার। ওপেনএআইকে জিজ্ঞাসা করুন, বলে দেবে ফিল্ডস মেডালিস্ট কারা।)

একবিংশ শতাব্দীর ঘোষণা প্রায়ই সংখ্যাতাত্ত্বিক। ঘোষণার আড়ালে কখনো সংখ্যা চাপা পড়ে। এ দেশে শহীদের সংখ্যা—মূলত ঘোষণা; প্রকৃত অর্থে, চাপা-পড়া সংখ্যা। সংখ্যা চাপা পড়লে বাড়তে পারে, কমতেও পারে।

(তবে সকল সংখ্যা ঘোষণা হিসেবে আসে না। যেমন, হামে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা।)

এ দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংখ্যার ঘোষণা হলো পে-স্কেলের ঘোষণা। লক্ষ কোটি টাকার ঘোষণা। অতি আনন্দের ঘোষণা! এদিকে, তেলের দাম লিটারে বিশ টাকা বাড়ার ঘোষণা হলো সবচেয়ে ভয়ের ঘোষণা। অবশ্য প্রধান ঘোষণাকারী ড. জাহেদ উর রহমান বলেছেন—সরকার আর কত ভর্তুকি দেবে!

তবে কান বুজে রাখলে ঘোষণায় কী-বা এসে যায়, যখন ঘোষণা দিয়েছি—আমিই জীবন।

আর কুয়াশার ভেতরে হেঁটে যায় মৌ অথবা শ্যামা।

Tags: , , , ,